ঐতিহাসিক সোনামসজিদ

Posted by imomins on May 23, 2011 at 1:02 AM

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুধু আম, কাঁসা-পিতল, রেশম ও লাক্ষার জন্য বিখ্যাত নয়। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থাপনা। স্থাপনাগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক সোনামসজিদ একটি অন্যতম নিদর্শন। যা জেলার পরিচিতিকে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে বিস্তৃত করেছে। জেলা শহরের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম কোণে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত ইসলামী প্রাচীন নিদর্শন হচ্ছে এই সোনামসজিদ। এর প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য অর্থাৎ নির্মাণের সন-তারিখ নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। এই মসজিদের সামনের মধ্য দরজার উপর দিকে অবস্থিত শ্বেতপাথরে হোসেন শাহ নামটি লেখা থাকায় অনুমান করা যায় যে, এটি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর শাসন আমলেই নির্মিত হয়। তার শাসনকাল ছিল ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ হিজরি ৮৯৯ থেকে ৯২৫ পর্যন্ত। তবে এই মসজিদটি নির্মাণের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। যেমন _ ১. হোসেন শাহর শাসনকালের মধ্যে আরবি কোনো এক সনের ১৪ তারিখে জনৈক ওয়ালী মুহাম্মদ এটি নির্মাণ করেন। ২. জনৈক নপুংসক কর্তৃক এ সোনামসজিদ নির্মিত হয়েছিল এবং আলাউদ্দিন হোসেন শাহর দরবারে কর্মরত কোনো কর্মচারী বা কোষাধ্যক্ষ কর্তৃক সোনামসজিদ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। ৩. এক প্রহর মতান্তরে সোয়া প্রহর (৩ ঘণ্টায় ১ প্রহর) এই এলাকায় আকাশ থেকে সোনা বর্ষিত হয়েছিল বলে মসজিদের নাম সোনামসজিদ হয়ে যায়। ৪. জনৈক ব্যক্তি অলৌকিকভাবে প্রচুর সোনা পেয়ে সে সোনার অর্থ দিয়ে এ মসজিদ নির্মাণ করে দেন বলে এর নামকরণ সোনামসজিদ হয়। ৫. জিন কর্তৃক সোনা দিয়ে এক রাতেই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে এর নাম সোনামসজিদ হয়ে যায়। এ মতানুসারীরা এও বিশ্বাস করেন যে, কেউ এ মসজিদের কোনো এক অংশের সোনার খণ্ড চুরি করে নেয় বলে আল্লাহর তরফ থেকে পরে তা ইট-পাথরে পরিণত হয়। যদিওবা এ মতটি অত্যন্ত দুর্বল। ৬. বিশেষ কারুকার্য খচিত অনেক মূল্যবান পাথর দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করতে অনেক অর্থ ব্যয় হয়েছিল, যা তৎকালীন সোনার মূল্যের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না বলে উপমিত করে এর নাম রাখা হয় সোনামসজিদ। আবার অনেকে বলেন, মসজিদের ভেতর ও বাইরে অনেক আলোক বিকিরণকারী শ্বেতপাথর ছিল, যার আলোকচ্ছটায় মসজিদের ভেতরসহ বাইরের দিকও সব সময় সোনার মতো উজ্জ্বল থাকত। এজন্য এর নামকরণ সোনামসজিদ। তবে যত মতান্তরই থাকুক না কেন, মধ্যযুগে নির্মিত এ সোনামসজিদটি কালের সাক্ষী হয়ে অনেক কিংবদন্তি নিয়ে আজও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার খ্যাতি ও সুনাম অক্ষুণ্ন রেখে চলেছে। এই স্থাপনার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয় প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের কথাকে। কারণ গৌড় বাংলার রাজধানী না হলে অভিনব এই শিল্পকলার আবির্ভাব ঘটত না। সব মিলিয়ে প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের পাদপীঠে অবস্থিত সোনামসজিদের স্থাপত্যকলার নিদর্শনগুলো জেলাকে করেছে সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত। তবে জেলার অধিকংশ প্রাচীন ঐহিত্যের ভাণ্ডারই হচ্ছে প্রাচীন গৌড় বা বর্তমানের সোনামসজিদ এলাকা। এই এলাকার ইসলামী শিল্পকলার নিদর্শনগুলো মুসলমানদের চেতনাকে আজও উদ্দীপিত করে চলেছে। এগুলো হলো দারুসবাড়ী মসজিদ, ধানইচকের মসজিদ, হজরত শাহ নেয়ামাতুল্লাহ (র.)-এর মাজার, শাহ সুজার দোতলা বাড়ি ইত্যাদি। সোনামসজিদের ঐতিহ্য ও এলাকার পুরাকীর্তি নিয়ে পরবর্তী শব্দগুলোর ইতিহাসবিদসহ বর্তমান যুগের অনেক গবেষক ও লেখক অনেক মূল্যবান তথ্যসমৃদ্ধ ও ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লিখেছেন। এসব তথ্য জানার আগ্রহ ও ইচ্ছা কালে কালে মানুষের মনে নতুন প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে।

সোনামসজিদের গঠনশৈলী হচ্ছে বাইরে সীমানাসহ দৈর্ঘ্য ৮২ ফুট ও প্রশস্ত সাড়ে ৫২ ফুট। ছাদ সমতল বরাবর এর উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট এবং ছাদের উপরে শোভিত গম্বুজগুলোর ব্যাস প্রায় ৩০ ফুট এবং পাথর দিয়ে এর দেয়ালের প্রকোষ্ঠে ছোট ইটের গাঁথুনি এবং বাইরের দিক মসৃণ ও হালকা কারুকার্য পাথর দিয়ে গেঁথে ইটগুলোকে আবৃত করা হয়েছে। পাথরগুলো গ্রুপ কেটে একটির সঙ্গে আর একটিকে অত্যন্ত মজবুত করে সংযুক্ত করা আছে। দেয়ালের ভেতর অংশেও কারুকার্য খচিত পাথর দিয়ে ইটগুলোকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তাই এ সোনামসজিদের চারদিকের দেয়ালের পুরুত্ব ইট-পাথর মিলিয়ে প্রায় ৬ ফুট দাঁড়িয়েছে। মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য সম্মুখভাগে একই মাপের ৫টি দরজা রয়েছে। এ দরজাগুলোর উচ্চতা ও প্রবেশপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ ফুট ও সাড়ে ৪ ফুট। এছাড়াও মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালেও ৩টি করে ৬টি দরজা আছে। এগুলো উচ্চতার দিক দিয়ে সামনের দিকের সমান হলেও প্রবেশপথের দৈর্ঘ্যের চেয়ে কম। তবে উত্তরের ৩টির মধ্যে একটিতে প্রবেশের স্থলে বাইরের দিকে একটি সিঁড়ি থাকায় তার উচ্চতা সব দরজার চেয়েও বেশি। ইমামের নামাজ পড়া বা খোতবা আদায়ের জন্য মসজিদ গঠনের নিয়ম অনুযায়ী পশ্চিম দেয়ালের মাঝ অংশে একটি কেন্দ্রীয় মেহরাব রয়েছে। এছাড়াও পাশে দুটি করে আরও ৪টি মেহরাব আছে। মসজিদের ভেতর প্রবেশ করার জন্য সামনে একটি তোরণ রয়েছে এবং মসজিদের ছাদে রয়েছে ১৫টি গম্বুজ। গম্বুজের ভেতর অর্থাৎ নিম্নাংশে বাংলার প্রকৃতির অসংখ্য বৈচিত্র্যময় ফল, ফুল, লতা-পাতা, শাখা গুচ্ছ দিয়ে নকশি কাঁথার মতো এমনভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা হয়েছে, যা দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, এগুলোর নকশা প্রণেতা শিল্পীরা এ কাজে অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

 


Categories: Personal, Public, Networking

Post a Comment

Oops!

Oops, you forgot something.

Oops!

The words you entered did not match the given text. Please try again.

You must be a member to comment on this page. Sign In or Register

0 Comments